HOMEHISTORYSUBJECTTEACHERFROMRESULTCLASS ROUTINECOLLEGE RULES

সময়ের পথ পরিক্রমায় একদিন থেমে যায় একজন ব্যক্তি মানুষের কর্মকোলাহল । মৃত্যঅনিবার্য, মৃত্যই সত্য ।মৃত্যুর মধ্য দিয়েই সমাপ্ত হয় জীবনের পান্ডুলিপি ।কিন্তু জগত সংসারে পড়ে থাকে মানুষের কর্ম ।সে কর্ম যদি হয় মহত্কল্যাণকর, তাহলে মানুষ হয় ইতিহাস, অমরতার আলোকরশ্মি ছড়ায় যুগ- যুগান্তর । আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ তেমনি একটি নাম,ইতিহাসের এক অংশ মহত্কর্ম তাকে করেছে মহিমান্বিত ।তিনি আজ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে গ্রহণীয়, বরণীয় অমর ব্যক্তিত্ব । আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার নিগুয়ারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ।নিগুয়ারী তার নানার বাড়ী । তাঁর পিতার নাম মরহুম রোস্তম আলী গোলন্দাজ ।তারা ছিলেন তিন ভাই । সবার বড় ছিলেন তিনি । অন্য দুই ভাই হলেন-মরহুম ইকবাল হোসেন গোলন্দাজ রতন, মরহুম ইমামুল হোসেন গোলন্দাজ মানিক।তার স্ত্রীর নাম মাহফুজা গোলন্দাজ । তিনি দুই ছেলে এবং এক কন্যা সন্তানের জনক ।তারা হলেন- ফুয়াদ গোলন্দাজ জগলু, ফাহমি গোলন্দাজ বাবেল (গফরগাঁও উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান) ,আন্জুম গোলন্দাজ ।আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের আদি পুরুষ ছিলেন পারস্যের অধিবাসী ।তারা মোগল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের সাথে ভারতবর্ষে আগমন করেন ।পরতর্তীতে মোগল সম্রাজ্যের বিস্তৃতির সাথে সাথে পারস্য জাতির বিভিন্ন গোত্র উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে ।

বাবরের গোলন্দাজ বাহিনীর কোন এক গোত্র পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে । পরে তাদের কেউ কেউ বাংলার নবাবের অধীনে চাকুরী গ্রহণ করেছিলেন । তারা ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ স্বাধীনতাপ্রিয় বীর যোদ্ধা । তাই বংশানুক্রমে নবাবের গোলন্দাজ বাহিনীতে তাদের স্থায়ী আসন রক্ষিত হয় ।বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌল্লার সাথে যখন রাজদরবারের সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজদেরকে সমর্থন করে,সেই দুর্দিনে নবাবের পক্ষে ছিলেন এই গোলন্দাজ বাহিনী ।পলাশীর

আম্রকাননে নবাবের পক্ষ হয়ে দেশপ্রেমিক মোহনলাল ও মীর মর্দান যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মরি মর্দানের অধীনস্ত এই গোলন্দাজ বাহিনীর সদস্যরাও যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন ।তারা নবাবের সাথে বেঈমানী করেননি ।যুদ্ধ পরাজিত হয়ে তারাও ষড়যন্ত্রকারী মীর জাফর ও ইংরেজদের কোপানলে পড়েন ।তাই জীবন বাচানোর তাগিদেই ভাগ্যান্বেষনে তারা মুর্শিদাবাদ ছেড়ে পূর্ববাংলায় চলে আসেন । অত:পর গোত্রের বিভিন্ন লোক বিভিন্ন দিক ছড়িয়ে পড়েন। একটি দলের সর্দার পীর মাহমুদ গোলন্দাজ ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার বাগুয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন ।তখন এই বাগুয়া ছিল হিংস্র জীব জন্তুতে ভরপুর নির্জন বনভূমি পীর মাহমুদ গোলন্দাজকে মুগ্ধ করেছিল ।তার যুদ্ধপ্রিয় মন এই নির্জন প্রকৃতির সাথে সংগ্রামের নতুন পথ খোঁজে পেয়েছিল। এখানেই তিনি স্থায়ীভাবে বসতি স্থ্পন করেন ।এখান থেকেই বর্তমান গোলন্দাজের গোড়াপত্তন । আলতাফ গোলন্দাজ ছিলেন পীর মাহমুদ গোলন্দাজের

ছেলে বারহামদী গোলন্দাজ, বারহামদী গোলন্দাজের ছেলে ইনসান আলী গোলন্দাজ, ইনসান আলী গোলন্দাজের ছেলে রোস্তম আলী গোলন্দাজ আর রোস্তম আলী গোলন্দাজের ছেলে আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ । ছাত্র জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী । তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে বি.এ.পাস করেন ।লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় ছিলেন বেশ পারদর্শী । কৈশোর থেকেই দুরন্ত গোলন্দাজ অন্যায়- অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন ।সততা ছিল তার সঙ্গী । অন্যায়ের সাথে, অসত্যের সাথে ,অকল্যাণের সাথে জীবনে কখনো কোন আপোষ তিনি করেননি ।সোনার চামচ মুখে নিয়ে তিনি জন্মে ছিলেন ।তত্কালীন সময়ে কোটিপতি পিতার ঘরে জন্ম নিলেও ধন-সম্পত্তি, বিত্ত-বৈভব-প্রাচুর্য তাকে স্পর্শ করতে পারে নি ।অতি সাধারণ, সাদামাটা জীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি ।নিজের সুখ নয়;দেখতে চেয়েছিলেনে মানুষের সুখ,গরীব -দুঃখী-অসহায়, নির্যাতিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের সুখ।স্বীয় মহত্কর্মের ভেতর দিয়ে তিনি রচনা করতে চেয়েছিলেন একটি শান্তিময় উদ্যান । তিনি মানুষকে ভালবেসেছেন এবং মানুষের ভালবাসাও পেয়েছেন। ছাত্র জীবনেই তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতির সঙ্গে ।তার রাজনৈতিক যাত্রা সূচিত হয় ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি দিয়ে ।তিনি ১৯৬৯ সালে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে গফরগাঁও কলেজ ছাত্র সংসদেরে ভি.পি. নির্বাচিত হন। পরবর্তী রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় তিনি যুক্ত হন আওয়ামীলীগে যোগদান করেন । ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে তিনি আওয়ামীলীগে যোগদান করেন ।১৯৮৯ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ।পরবর্তীতে ১৯৯১,১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ।আলতাফ গোলন্দাজ আধুনিক গফরগাঁওয়ের উন্নয়নের জনক ।তিনি পশ্চাত্পদ গফরগাঁওকে নিজের মতো করে সাজিয়েছিলেন । রাজধানী ঢাকা কিংবা জেলা সদর ময়মনসিংহের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল ট্রেন ।পাশাপাশি থানা সদরের সাথে বিভিন্ন ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক ।এই অবস্থা তাকে দারুভাবে ভাবিয়ে তুলেছিলেন ।তিনি চেয়েছিলেন এই নাজুক অবস্থা থেকে গফরগাঁওবাসীকে মুক্তি দিতে ।তিনি হাত দিলেন এবং তার হাতের ছোঁয়ায় সেদিনের গফরগাঁও আর আজকের গফরগাঁয়ের মাঝে সূচিত হল আকাশ পাতাল ব্যবধান ।উন্নয়নের যাদু স্পর্শে রঙিন হলো গফরগাঁও ।যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি যে বিপ্লব আনয়ন করলেন, তা গফরগাঁওবাসী যুগের পর যুগ মনে রাখবে ।

আজকের উত্তর গফরগাঁও, দক্ষিণ গফরগাঁও কিংবা দেশের যে কোন স্থানের সাথে যোগাযোগের জন্য এতদঅঞ্চলের মানুষকে আর ভাবতে হয় না ।তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী এক বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ।যোগাযোগের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও এক অনন্য সফল বিপ্লব আনেন তিনি।

শিক্ষানুরাগী হিসাবে তত্কালীন সরকার তাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত করেছিল ।শিক্ষার আলো ছড়ানোর লক্ষে তার পিতা মরহুম রোস্ত আলী গোলন্দাজ প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন রোস্তম আলী গোলন্দাজ উচ্চ বিদ্যালয়, জে.এম সিনিয়র মাদ্রাসা ।তাছাড়াও বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত স্কুল, কলেজ,মাদ্রাসা,মসজিদ নির্মানেও তার ভূমিকা ছিল ।যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান হিসেবে তিনি একক দান,ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিজস্ব জমির উপর প্রতিষ্ঠা করেছেন আলতাফ গোলন্দাজ মহাবিদ্যালয় । পরবর্তীতে এটি ডিগ্রী পর্যায়ে উন্নীত হয় । কলেজটি শিক্ষার আলো বিস্তারের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে এবং সর্বমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে ।একক দান ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আলতাফ গোলন্দাজ মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা,অবকাঠামোগত উন্নয়ন,শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ আনয়ন ,নকলমুক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সর্বজনবিদিত ।গফরগাঁও মহিলা কলেজ অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ।এক পর্যায়ে কলেজটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় ।আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলেজটি পূর্ণাঙ্গ কলেজটি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় ।কাওরাইদ-গয়েশপুর কলেজ প্র্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা অনস্বীকার্য ।কলেজের নামে তিন জমি দান করেছেন এং পূর্ণাঙ্গ কলেজের স্বীকৃতি আনয়নে রেখেছেন অসামান্য ভূমিকা ।গফরগাঁও উপজেলার এমন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই,যেখানে তার হাতের উন্নয়নের স্পর্শ লাগেনি ।গরীব ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখার গতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে নিজস্ব অর্থায়নে বৃত্তির ব্যবস্থা করেন ।ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারে তিনি ছিলেন অন্যন্যসাধারণ একজন ধর্মভীরু মানুষ হিসাবে তিনি গফরগাঁওয়ে অসংখ্য মসজিদ, মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন ।আলেম ওলামাদের প্রতি তার ছিল অগাধ শ্রদ্ধাবোধ ।একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসাবেও তার রয়েছে সুনাম ।সকল ধর্মের,সকল বর্ণের মানুষের প্রতি ছিল তার প্রগাঢ় ভালবাসা ।একদিন অবক্ষয়ের আছন্ন ছিল গফরগাঁওয়ের সমাজ ব্যবস্থা ।নানাবিধ অসামাজিক কাজ, কুসংস্কার ও ব্যভিচারে আছন্ন ছিল গফরগাঁওয়ের মানুষ ।মদ,জুয়া,হাউজি আর অবাধ নৃত্যের লীলাক্ষেত্র ছিল গফরগাঁও ।জাতির অহংকার যুবসম্প্রদায় ছিল হতাশাগ্রস্থ ।নৈতিক অবক্ষয় তাদেরকে জীবন থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছিল ।এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে গফরগাঁওকে রক্ষা করেন আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ ।তিনি এম.পি নির্বাচিত হয়ে প্রথমেই গফরগাঁও থেকে মদ, জুয়া, হাউজিসহ সকল অসামাজিক কাজ নিষিদ্ধ করেন ।

তিনি আমৃত্য ঘুমকে হারাম করে, নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে মানুষের সেবা করেছেন,মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেছেন,এলাকার উন্নয়ন করেছেন,সামাজিক অবক্ষয় থেকে সমাজকে রক্ষা করেছেন । শান্তিকামী সংগ্রামী এই মহান পুরুষ আমাদেরকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে গত ২০০৭ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী চলে গেলেন চিরন্তন সত্যের ঠিকানায়।তিনি চলে গেলেও আমাদের মন থেকে মুছে যাননি ।স্বীয় মহত্কর্মের জন্য বেচেঁ আছেন, বেচেঁ থাকবেন যুগ-যুগান্তর ।

 

 

   

 

 

 

ALL RIGHT RESERVED BY ALTAF GOLANDAZ DEGREE COLLEGE

Developed by

SOBRO WEB